স্বতন্ত্র বলয় - স্টিফেন জে গুল্ড
অনুবাদক: শিক্ষানবিস
সামঞ্জস্যহীন স্থানগুলো কখনও কখনও ব্যতিক্রমী সব গল্পের ইন্ধন যোগায়। ১৯৮৪ সালের প্রথম দিকে আমি ভ্যাটিকানে কয়েক রাত কাটিয়েছিলাম। আমাকে থাকতে দেয়া হয়েছিল এমন এক হোটেলে যা মূলত পর্যটনশীল ধর্মপ্রচারকদের জন্য নির্মিত। সেখানে প্রতিটি বাথরুমে ইচ্ছাকৃতভাবে বিডেট (বিশেষ ধরণের জলশৌচের পাত্র) এর ব্যবস্থা করা ছিল। প্রাতঃরাশে প্রতিদিনই দেয়া হত আলুবোখারার জ্যাম। প্রতিদিন এই এক জ্যাম খেতে খেতে বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল। বুঝতেই পারছিলাম না, প্রাতঃরাশের ঝুড়িতে এই এক ধরণের আলুবোখারা ছাড়া অন্য কিছু দিলে কি হয়, যেমন একটু স্ট্রবেরিও তো দিতে পারে। এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে তুলনামূলক সংস্কৃতির অসংখ্য বিষয় থেকে এমন একটির সাথে আমার সম্যক পরিচয় ঘটে গেলো যা জীবনকে অনেক আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। আমাদের বিজ্ঞানী গ্রুপটা রোমে গিয়েছিলো "পন্টিফিশিয়াল একাডেমি অফ সাইন্সেস" কর্তৃক স্পন্সরকৃত একটি সম্মেলনে যোগ দিতে। সম্মেলনের বিষয় ছিল "নিউক্লিয়ার উইন্টার"। হোটেলে আমাদের সাথে ছিল ফরাসি এবং ইতালীয় ধর্মপ্রচারকদের একটা দল যাদের সবাই আবার পেশাদার বিজ্ঞানী।
দুপুড়ের খাবারের সময় ধর্মপ্রচারকেরা আমাকে তাদের টেবিলে ডেকে নিয়ে যায় এমন একটি সমস্যা সম্বন্ধে বলার জন্য যা তাদেরকে বিশেষ ঝামেলায় ফেলে দিচ্ছে। তারা জানতে চাচ্ছিলেন "বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্ব" বিষয়ে আমেরিকায় কি ধরণের কথাবার্তা চলছে? একজন জিজ্ঞেস করলেন: "বিবর্তন কি আসলেই আমাদের জন্য ঝামেলার কারণ? যদি হয়েই থাকে তবে সেই ঝামেলাটা কি রকম? আমি সবসময় শিক্ষা দিয়ে এসেছি যে, ক্যাথলিক বিশ্বাস এবং বিবর্তনের মধ্যে কোন নীতিগত বিরোধের অস্তিত্ব নেই। আর বিবর্তনের প্রমাণগুলো সবই খুব সন্তোষজনক এবং অভিভূত করে দেয়ার মত। আমি কি কিছু ভুল বললাম?"
এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে ফরাসি, ইতালীয় আর ইংরেজির পাঁচমিশালীতে বেশ প্রাঞ্জল কথোপকথন চললো। আমার সাধারণ উত্তরটি সব ধর্মপ্রচারকদেকেই পুনরায় আশ্বস্ত করলো। আমার উত্তরটি হল: বিবর্তন কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ঝামেলার জন্ম দেয়নি; কোন নতুন তর্কও সৃষ্টি করেনি। আমেরিকার সমাজ-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তাদের নিজেদের মত করেই সৃষ্টিতত্ত্ব বেড়ে উঠেছে। সেখানে একসময়ের সব দলছুটেরা মিলে প্রোটেস্ট্যান্ট মৌলবাদের এমন একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছে যাতে বিশ্বাস করা হয়, বাইবেলের প্রতিটি শব্দ আক্ষরিক অর্থেও নির্ভুল। তাদের এই দাবীর সুস্পষ্ট কোন অর্থ আমার জানা নেই। কথা শেষে আমরা সবাই আশ্বস্ত হলাম যে, বিবর্তন সম্পূর্ণ সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে এর সহাবস্থানও নিশ্চিত হয়েছে। সবাই আশ্বস্ত হলেও আমার বিস্ময়ের ঘোর কেটে যাচ্ছিলো এই ভেবে যে, ইহুদি অজ্ঞেয়বাদী হিসেবে ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারকদেরকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে কত ব্যতিক্রমী ভূমিকাই না পালন করলাম।
একই ধরণের আরেকটি গল্প বলি: আমাকে হরহামেশাই একটি প্রশ্ন করা হয়, হার্ভার্ডের ছাত্রদের মধ্যে সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়টি কখনও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে কি-না। উত্তরে আমি বলি, সুদীর্ঘ ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কেবল একবারই এ ধরণের ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এক অতি মনোযোগী ও নিয়মনিষ্ঠ নতুন ছাত্র এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "আমি একজন নিবেদিতপ্রাণ খ্রিস্টান এবং বিবর্তনবাদ নিয়েও আমার কোন সন্দেহ নেই। কারণ বিবর্তন খুব চমৎকার একটি বিষয় যার সপক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে। কিন্তু আমার ইভানজেলিক্যালে ধর্মান্তরিত রুমমেট বলে, আমি একইসাথে বিবর্তনবাদী এবং খ্রিস্টান হতে পারি না। তাহলে এবার বলুন, কারও পক্ষে কি ঈশ্বর এবং বির্তনবাদ উভয়টিতেই একসাথে বিশ্বাস রাখা সম্ভব?" সে সময়ও আমি নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব পালন করেছিলাম, আমি তাকে পুনরায় আশ্বস্ত করেছিলাম যে, বিবর্তন সম্পূর্ণ সত্যি এবং খ্র্রিস্টান ধর্মের সাথে এর সহাবস্থান সম্ভব। আমি এই অবস্থানে খুব দৃঢ়, যদিও জানি একজন ইহুদি অজ্ঞেয়বাদীর পক্ষে এটা বেশ বেমানান।
এই গল্প দুটিতেই একটি মুখ্য বিষয় উঠে এসেছে। বিষয়টা হল বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্ব। ধর্মে বিশ্বাসীরা নিজেরাই এই বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্ব নামটি দিয়েছে। সাধারণ যুক্তিবাদী বা বিজ্ঞানী সমাজে এটি কখনই স্বীকৃতি পায় না, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। এই সৃষ্টিতত্ত্বের ভাষ্য হচ্ছে: বাইবেলের প্রতিটি শব্দ সত্য, সমগ্র জীবকূলকে পার্থিব ৬ দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে, পৃথিবীর জন্ম মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে এবং সর্বোপরী বিবর্তনবাদ মিথ্যা। গল্পগুলো পড়ে অনেকেই হয়তো বুঝতে পেরেছেন- সৃষ্টিতত্ত্ব বিজ্ঞানকে ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয় না, কারণ এ ধরণের কোন যুদ্ধের অস্তিত্বই নেই। সৃষ্টিতত্ত্ব জীববিজ্ঞানের প্রকৃতি বা জীবনের ইতিহাস বিষয়ে কোন সমাধানহীন বুদ্ধিবৃত্তিক ইস্যুর জন্ম দেয় না। সৃষ্টিতত্ত্ব খুবই সংকীর্ণ ও স্থানীয় একটি আন্দোলন। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই এটি শক্তিশালী এবং তার মধ্যেও কেবল প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মের অনুসারী কিছু সেক্টরেই এর প্রভাব বেশী। এই প্রোটেস্ট্যান্টরা মনে করে, বাইবেল যেভাবে আছে সেভাবেই পড়তে হবে, এর আক্ষরিক অর্থই ধরতে হবে।
আমি এখানে বলতে চাই, কারও ইচ্ছা হলে গোঁড়া প্রোটেস্ট্যান্ট কোন ধর্মপ্রচারক রেখে বিজ্ঞানের পরিবর্তে সৃষ্টিতত্ত্বের মাধ্যমে জীববিজ্ঞান শিক্ষা করতে পারে। গোঁড়া ইহুদি হলে কোন মৌলবাদী রাব্বি রেখে তার নিজস্ব ইয়েশিভায় বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্ব চর্চা চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাইবেল সাহিত্যের ভিত্তিতে নির্মিত এ ধরণের সৃষ্টিতত্ত্ব কিন্তু ক্যাথলিক বা ইহুদিদের কাছে অর্থহীন। কারণ মূলধারার ইহুদি বা ক্যাথলিক ধর্মে বাইবেলের আক্ষরিক অর্থ করা হয় না। তারা মনে করে, বাইবেলের সব কথাই রূপক এবং উপমানির্ভর। যেকোন উঁচুমানের সাহিত্যেই কিন্তু উপমা এবং রূপক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ক্যাথলিক ও ইহুদিরা মনে করে বাইবেলের কথাগুলোকে সঠিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে গ্রহণ করতে হবে, আক্ষরিকভাবে নয়। দেখা যাচ্ছে, কেবল প্রোটেস্ট্যান্টরাই আক্ষরিক অর্থ করে। তাও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে সবাই না, গুটিকয়েক মৌলবাদী শ্রেণী।
গল্প এবং ব্যাখ্যার মাধ্যমে আমি নিজের যে অবস্থান তুলে ধরলাম, পশ্চিমা বিজ্ঞান এবং বড় সবগুলো পশ্চিমা ধর্মের অবস্থানই এখন এরকম। প্রাচ্যের ধর্ম সম্বন্ধে খুব বেশী জানি না বিধায় কিছু বলছি না। তবে আমার মনে হয়, সেখানেও এটি গুরুত্ব পাবে। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে সংঘাত তখনই হ্রাস পাবে যখন হ্রাস পাবে এদের ভিন্ন ধরণের ক্ষেত্রদ্বয়ের মধ্যে অধিক্রমণ। বিজ্ঞানের ক্ষেত্র হবে মহাবিশ্বের গঠন ও বিবর্তনের পরীক্ষণনির্ভর ব্যাখ্যা আর ধর্মের ক্ষেত্র হবে মানুষের প্রকৃত নৈতিক মূল্যবোধ এবং জীবনের আধ্যাত্মিক অর্থের সন্ধান। এই ক্ষেত্র দুটি একেবারে পৃথক করে ফেললেই আর সংঘাত থাকে না। মানুষের জীবনে সামগ্রিক প্রজ্ঞা অর্জন করতে হলে এই দুটি ক্ষেত্রেই অত্যধিক মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কারণ এক মহান পুস্তক আমাদের জানিয়েছে, সত্যই আমাদেরকে মুক্তি দিতে পারে এবং ন্যায়-নীতি, দয়া ও বিনয় শিখলেই আমরা প্রতিবেশের সবার সাথে মিলে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারি।
এই আদর্শ অবস্থানের প্রেক্ষিতে পোপ জন পল ২ এর বলা একটি কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। ১৯৯৬ সালের ২২শে অক্টোবর পন্টিফিশিয়াল অ্যাকাডেমি অফ সাইন্সেসকে (যে একাডেমি আমার ভ্যাটিকান সফরের ব্যায়ভার বহন করেছিল) উদ্দেশ্য করে তিনি কথাটি বলেছিলেন। তার কথায়: "সত্য কখনও সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না।" পোপ বিবর্তনের প্রমাণগুলোকে সমর্থন করেছিলেন এবং একই সাথে বিবর্তনবাদী তত্ত্বের সাথে ক্যাথলিকদের সহাবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। বিশ্বের সব বড় বড় সংবাদপত্রের হেডলাইন হিসেবে পোপের এই কথা ছাপা হয়েছিল। যেমন ২৫শে অক্টোবরে নিউ ইয়র্ক টাইম্সের হেডলাইন ছিল:
'Pope Bolsters Church's Support for Scientific View of Evolution.'
আমি অবশ্যই "স্বল্প খবরের দিন" বিষয়টা মানি। হয়তোবা হেডলাইনে দেয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোন খবর ছিল না সেদিন। পোপ এই কথা না বললে ঐদিন টাইম্স "রস ডোলের উপদেশ গ্রহণে রস পেরোর অস্বীকৃতি এবং তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পরিত্যাগ" ছাড়া অন্য কোন খবর হেডলাইন করতে পারতো না। তারপরও কেবল পোপের এই কথাটার প্রতি সকল স্তরের সব মানুষের এতো আকর্ষণ দেখে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। ক্যাথলিক চার্চ কখনই বিবর্তনের বিরোধিতা করেনি এবং বিরোধিতা করার মত কারণও উপস্থিত হয়নি। পোপই বা কেন এমন একটা কথা বললেন? আর এই কথা শুনে বিশ্বের সব বড় বড় পত্রিকা এটাকেই কেন হেডলাইন করে ফেললো?
প্রথমে আমি এর একটি কারণই ভাবতে পারছিলাম, সব সংবাদিকরাই হয়তো বিজ্ঞান ও ধর্মের সম্পর্কটা ভুল বুঝেছে এবং এ কারণেই পোপের একটি সাধারণ কথাকে ওয়ারেন্টিবিহীন মন্তব্যের মত ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু শীঘ্রই আমার এ ভুল ধারণা ভেঙে যায়। সম্ভবত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই মনে করে, বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে যুদ্ধ চলছে এবং বিবর্তন নিশ্চয়ই খ্রিস্টান ধর্মের মর্মমূলে আঘাত করে। সে হিসেবে চার্চ যদি কখনও বিবর্তনের বর্তমান অবস্থাকে মেনে নেয় তাহলে সেটাই তো প্রধান খবর হওয়ার কথা। আধুনিক কালে এমনটি ঘটলেও অতীতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়েই এটা ঘটেনি। সে সময় ঘটলে হয়তো খবরটা আরও ছড়িয়ে পড়তো। যেমন ধরুন, ১৬৪০ সালে পোপ আর্বান ৩ তার সবচেয়ে বিখ্যাত ঘরবন্দিকে মুক্তি দিয়ে বলছেন, "মহামান্য গ্যালিলিও, আপনিই ঠিক। সূর্যই কেন্দ্রে আছে।" ভেবে দেখুন কেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠতো এই খবরটা।
পরে আমি আবিষ্কার করলাম, বিবর্তন বিষয়ে চার্চের সন্তোষের এই খবরটা সব পত্রিকায় হেডলাইন হয়ে যাবার কারণ নন-ক্যাথলিক ইংরেজিভাষী সাংবাদিকদের ভুল বোঝা নয়। ভ্যাটিকান নিজেই এই উক্তিটিকে প্রধান সংবাদ বিজ্ঞপ্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। আর এই প্রধান বিজ্ঞপ্তিটি ইতালীয় সংবাদপত্রে ফলাও করে ছাপা হয়েছিল। যেমন, রক্ষণশীল ইল জিওর্নাল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল: "পোপ বললেন বানর থেকে আমাদের উৎপত্তি হতেও পারে"।
স্পষ্টতই আমি প্রথমে ভুল বুঝেছিলাম এবং পরে সত্য আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছিলাম। কিন্তু, পোপের উক্তিতে এর থেকেও বেশী কোন আবেদন ছিল, কি হতে পারে সেটি? ক্যাথলিক চার্চ সম্পর্কে আমি যা বলেছি তা আরেকবার চিন্তা করে দেখলেই এই আবেদনটা পরিষ্কার হয়ে যায়। ক্যাথলিক চার্চ সব সময়ই বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে মূল্যায়ন করে, বিজ্ঞানকে ধর্মের জন্য হুমকি মনে করে না। ক্যাথলিক বিশ্বাসীদের কাছে বিজ্ঞানের গুরুত্ব আছে, এমনকি ক্যাথলিক নীতিতেও বিবর্তনের বৈধতাকে গ্রহণ করে নেয়া হয়েছে। তারা বিবর্তনকে বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা এবং এর সাথে ক্যাথলিক বিশ্বাসের সহাবস্থানকে সমর্থন করে।
টিপ ও'নেইলের গঠনতন্ত্র রচনায় অংশ নিয়েছিলাম বিধায় আমি জানি যে, "সব রাজনীতিই স্থানীয়"। সুতরাং ভ্যাটিকানেরও নিশ্চয়ই বিবর্তন এবং বিজ্ঞান বিষয়ে একটি অভ্যন্তরীন সিদ্ধান্ত আছে যা আমার কাছে অনেকটাই অস্বচ্ছ। একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তিতে বিবর্তনের পক্ষ নেয়ায় আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠেছে সেটা। আসলে আমি জানতাম, গুরুত্বপূর্ণ একটা অন্তমিল খুঁজে পাচ্ছি না। এ কারণে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ঠিক তখনই বুদ্ধিবৃত্তির একটা মুখ্য নীতি মনে পড়ে গেল: বিভ্রান্তিতে পড়লে একেবারে প্রাথমিক নথিপত্রগুলো পড়তে ভাল লাগে, অর্থাৎ এই বিভ্রান্তি বিষয়ক পাঠটা অশেষ কাজে দেয়। আমার মার্কিন অভিজ্ঞতার একটা বড় অংশ থেকে এই সরল ও মুখ্য নীতিটা উধাও হয়ে গিয়েছিল।
মুখ্য নথিপত্র বলতে আমি পোপ পায়াস ১২ (যাকে আমি খুব একটা পছন্দ করতাম না) এর একটা উক্তিকে বুঝাচ্ছি। ১৯৫০ সালে করা এই উক্তির বিষয়টি হিউম্যানি জেনেরিস নামে পরিচিত। এই উক্তির ধাক্কাটা পুরো বিপরীতমুখী, পায়াস ১২ বলেছিলেন: মানব দেহের বিবর্তন বিষয়ে বিজ্ঞান যা কিছু বের করছে তা ক্যাথলিকরা ততক্ষণই বিশ্বাস করতে পারবে যতক্ষণ তারা এটাও বিশ্বাস করবে যে, এই বিবর্তন ধারার কোন এক পর্যায়ে ঈশ্বর সৃষ্ট জীবের মধ্যে আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন। আমি জানতাম, এই উক্তি কোন সমস্যাই না। কারণ, আত্মা বিষয়ে আমি যা-ই বিশ্বাস করি না কেন বিজ্ঞানের পক্ষে তার এক বর্ণও ব্যাখ্যা করা সম্ভব না। অর্থাৎ, সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এবং ভিন্ন এই ধর্মীয় ইস্যুতে ধর্মতত্ত্বের অবস্থান বিজ্ঞানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে না। অন্য কথায়, পোপ পায়াস ১২ ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞানের সম্পর্কহীন অবস্থানকে সম্মান দেখিয়েছেন। এ কারণেই আমি হিউম্যানি জেনেরিসের পক্ষে যদিও জেনেরিসের পুরো লেখাটা আমি কখনই পড়ে দেখিনি। এই যুগে অবশ্য জেনেরিসের বিষয়টা কোন সিদ্ধান্ত গ্রহনে খুব একটা উপযোগী না।
এ সম্পর্কিত সব ধরণের লেখা খুঁজে পাই ইন্টারনেটে। ইন্টারনেটে পোপের উপস্থিতির কোন অভাব নাই। তবে আমার ইন্টারনেট দক্ষতার যথেষ্ট অভাব আছে। তাই কম্পিউটার বিষয়ে জানলেওয়ালা এক সহযোগীর সাহায্য নিলাম নেট থেকে তথ্যগুলো বের করে আনার জন্য। নেট থেকে নামিয়ে পোপ পায়াসের হিউম্যানি জেনেরিস বিষয়ক সবকিছু পড়লাম, সেই সাথে ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে পোপ জন পলের ঘোষণাটাও পড়লাম। এত কিছু পড়ার পর বুঝতে পারলাম, পোপ আর্বানের এই উক্তিটা এত নতুন ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে কেন। সেই সাথে বুঝতে পারলাম, বিজ্ঞান এবং ধর্মের জগতে বসবাসকারী আমার সব বিবর্তনবাদী বন্ধুদেরকে এই উক্তিটা কত আশা দেখাতে পারে।
হিউম্যানি জেনেরিসের লেখাটার মূল বিষয় ছিল চার্চের ম্যাজিস্টারিয়া তথা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষাক্ষেত্র। ম্যাজিস্টারিয়া শব্দটি কিন্তু ম্যাজেস্টি (ক্ষমতা) থেকে আসেনি। ম্যাজিস্টার লাতিন শব্দ যার অর্থ শিক্ষক। তাই ম্যাজিস্টারিয়ার অর্থ শিক্ষা। আমি মনে করি, এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় ধারণাটি তুলে ধরার জন্য ম্যাজিস্টারিয়া শব্দটি ব্যবহার করা যায়। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে তথাকথিত যুদ্ধের সমাধানকল্পেও এই শব্দের উপযোগিতা আছে। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে কোন সংঘাত থাকার কথা না, কারণ এ দু'টির শিক্ষা কর্তৃপক্ষ (ম্যাজিস্টারিয়াম) বা শিক্ষাক্ষেত্র সম্পূর্ণ আলাদা এবং এই শিক্ষাক্ষেত্র দুটি একে অন্যকে অধিক্রমণ করে না। এই মৌলিক ধারণাটির নাম আমি দিতে চাই 'Nonoverlapping magisteria" (NOMA)' তথা 'স্বতন্ত্র বলয়'।
বিজ্ঞান যৌক্তিক মহাবিশ্ব নিয়ে পরীক্ষণমূলক কাজ করে: মহাবিশ্ব কি দিয়ে গঠিত (বাস্তবতা) এবং এটি কেন এরকম আচরণ করে (তত্ত্ব) তা দেখাই তার কাজ। অন্যদিকে ধর্ম নৈতিক মূল্যবোধ এবং নৈতিকতার অর্থ নিয়ে কাজ করে। গতানুগতিক ভাষায় বলতে গেলে, আমরা প্রস্তর যুগ খুঁজে বের করি আর ধর্ম যুগের প্রস্তরকে নিজের মধ্যে ধরে রাখে; আমরা স্বর্গ কিভাবে কাজ করে তা নিয়ে গবেষণা করতে পারি আর ধর্ম নির্ধারণ করে কিভাবে স্বর্গে যাওয়া যায়।
ধর্ম আর বিজ্ঞানের মধ্যে সমঝোতাটা একেবারে স্বচ্ছ হয়ে যাবে যদি দুই অনধিক্রমণীয় বলয়ের মধ্যে একটি চূড়ান্ত নো ম্যান্স ল্যান্ড থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এরা অধিক্রমণ তো করেই এমনকি একে অপরের বিরুদ্ধে লেগে ম্যাসাকার করে ফেলে। এ কারণে তাদের সীমান্ত বরাবর অবিশ্বাস্য জটিল সব উপায়ে গুঁতোগুতি চলতে থাকে। আমাদের অনেক প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তরের বিভিন্ন অংশ খুঁজে বের করার জন্য উভয়ের দারস্থ হতে হয়। আর কোন উত্তরটি কোন অংশ থেকে খুঁজব তা নির্ধারণ করাও বেশ জটিল এবং কঠিন। এক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের নাম করা যায় যেগুলো বিবর্তন এবং নৈতিকতা উভয় ক্ষেত্রের সাথেই সম্পর্কিত: বিবর্তন যেহেতু আমাদেরকে অতি উন্নত পর্যায়ের চেতন সম্পন্ন একমাত্র পার্থিব সৃষ্টি করে তুলেছে, সেহেতু অন্যান্য প্রজাতির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বগুলো কি? অন্যান্য জীবের সাথে আমাদের বংশানুক্রমিক বন্ধন মানব জীবনের কী অর্থকে নির্দেশ করে?
পায়াস ১২ এর হিউম্যানি জেনেরিস খুবই প্রথাগত একটি দলিল। আর এই দলিল উপস্থাপন করেছেন এমন এক রক্ষণশীল ব্যক্তি যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে উদ্ভূত বিভিন্ন "বাদ" এবং তার সাথে হতাশাবাদের চাপে পড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এর সাথে তাকে "হলোকাস্ট" এর ভস্ম থেকে মানবতার শিষ্টাচারকে আবার জাগিয়ে তোলার জন্য সংগ্রামের বার্তা বহন করতে হয়েছিল। এ বিষয়ে পোপলিখিত পত্রের উপ-শিরোনাম ছিল "এমন কিছু মিথ্যা মতামত সম্পর্কে যেগুলো ক্যাথলিক মতাদর্শের ভিত্তিকে খাটো করে"। এই পত্র শুরু হয়েছিল আত্মরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা কিছু কথা দিয়ে:
নৈতিক এবং ধর্মীয় বিষয়ে মানুষের মতানৈক্য এবং ভুলের কারণে সব যুগেই ভাল মানুষদেরকে কষ্ট পেতে হয়েছে, কিন্তু সবচেয়ে বেশী কষ্ট পেতে হয়েছে চার্চের সত্যবাদী এবং ন্যায়নিষ্ঠ সন্তানদের। বিশেষতঃ আজকে যখন আমরা দেখি, খ্রিস্টান সংস্কৃতির নীতিগুলোকে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করা হচ্ছে।
পায়াস চার্চের বহিঃস্থ শত্রুদেরকে আক্রমণ করে এখানে কিছু কথা বলেছেন। এই শত্রুদের মধ্যে আছে সর্বেশ্বরবাদ, অস্তিত্ববাদ, দ্বান্দ্বিকতামূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিকতাবাদ এবং সবচেয়ে বড় শত্রু সাম্যবাদ। এরপর তিনি দুঃখের সাথে বলেছেন, চার্চের মধ্যে অবস্থানকারী কিছু বিজ্ঞ ব্যক্তি এক ভয়ানক আপেক্ষিকতাবাদের কবলে পড়েছেন- "এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক শান্তিবাদ এবং সমতাবাদ, যেখানে সকল দৃষ্টিভঙ্গিই সঠিক হয়ে উঠে"। তারা এর কবলে পরেছেন এই ভেবে যে, এর মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদেরকে একীভূত করা যাবে যারা স্থির কোন বিশ্বাস গ্রহণ করেনি, যারা খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে কিন্তু নির্দিষ্টভাবে ক্যাথলিক শিক্ষাক্ষেত্রকে মেনে নিতে চায় না।
কি সব অনিষ্টকর অভিনবত্বের জন্ম হল যারা অবতীর্ণ এবং প্রতিষ্ঠিত এক আইনকে এভাবে থমকে দিতে চায়! এ কোন পথে চলেছে পৃথিবী? একজন রক্ষণশীলের রক্ষণশীল কথাবর্তা হিসেবেই শোকাহত পায়াস বলে গেছেন:
এ ধরণের অভিনবত্বগুলো ইতোমধ্যেই ধর্মতত্ত্বের সকল শাখায় তাদের মারণ ফলাফলের প্রদর্শনী ঘটিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তোলে, ফেরেশতাদের ব্যক্তি সত্তা আছে কি-না এবং পদার্থ এবং আত্মার মধ্যে আসলেই কোন পার্থক্য আছে কি-না। অনেকে এমনটি পর্যন্ত বলে, আন্তঃপ্রমাণীকরণের (Transubstantiation) নীতিকে এমনভাবে সংশোধন করা উচিত যাতে পবিত্র ইউক্যারিস্টে খ্রিস্টের বাস্তব অস্তিত্বকে এক ধরণের প্রতিকী বিষয়ে নামিয়ে আনা যায়। বস্তু বিষয়ক কিছু সুপ্রাচীন দার্শনিক ধারণার উপর ভিত্তি করে এই আন্তঃপ্রমাণীকরণ নীতিমালার জন্ম হয়েছিল।
পায়াস প্রথমে বিবর্তনের উল্লেখ করেছিলেন একটি অতিরঞ্জনের বিরুদ্ধে মত প্রকাশের জন্য। এই অতিরঞ্জনের উদ্ভব ঘটেছিল কিছু অভিশপ্ত মতবাদের হিংসুক সমর্থকদের মাধ্যমে:
অনেকে ঠিকমতো কিছু না ভেবেই গোঁড়ার মত বলে যায়, বিবর্তনের মাধ্যমে নাকি সবকিছু উৎপত্তির ব্যাখ্যা দেয়া যায়। সাম্যবাদীরা এই মতবাদকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নেয় কারণ তারা জানতো, নির্দিষ্ট ঈশ্বরের ধারণা থেকে যখন সব মানুষ মুক্ত হয়ে যাবে, তখন তারা নিজেদের দ্বান্দ্বিকতামূলক বস্তুবাদ আরও প্রচার করতে পারবে এবং এর বিরোধীতাকে দমন করতে পারবে।
বিবর্তন বিষয়ে পায়াসের চূড়ান্ত বক্তব্যটি এসেছে পত্রের একেবারে শেষ দিকে, ৩৫ থেকে ৩৭তম অনুচ্ছেদের মধ্যে। এখানে তিনি "নোমা" (NOMA) এর প্রমিত মডেলটি সর্বান্তকরণে মেনে নেন এবং স্বীকার করেন, বিবর্তন এমনই কঠিন এক ভূমিতে অবস্থান করছে যেখানে একে অপরের প্রবল বিরোধিতা করতে থাকে। "এখন সেই বিশেষ প্রশ্নগুলো সম্পর্কে আমাদেরই কথা বলতে হবে, যে প্রশ্নগুলো ইতিবাচক বিজ্ঞানের অংশ হলেও খ্রিস্টান বিশ্বাসের সত্যের সাথে কম-বেশী নিবিঢ়ভাবে সম্পর্কিত।" [মজার ব্যাপার হচ্ছে এই অনুচ্ছেদগুলোতে পায়াস বিবর্তনকে সরাসরি সম্বোধন করেননি, বরং "পলিজেনিজ্ম" নামের এক মতবাদকে অমূলক প্রমাণ করার জন্য সব বলেছেন। এই মতবাদে মানুষের পূর্বপুরুষ বিভিন্ন পিতা-মাতা থেকে উদ্ভূত হয়েছে বলে মনে করা হয়। পায়াসের মতে এই মতবাদ কোনভাবেই মূল পাপের নীতির সাথে খাপ খায় না। "মূল পাপ বলতে আদম-হাওয়ার করা পাপকে বোঝায় যা বংশানুক্রমে সব মানুষের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে।" এক্ষেত্রে পায়াস হয়তো নোমার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। কিন্তু আমি এর বিচার করতে পারি না, কারণ আমি ক্যাথলিক ধর্মতত্ত্বের খুটিনাটি জানি না এবং এ ধরণের কথাকে কোন প্রতীকি অর্থে গ্রহণ করতে হবে তাও জানি না। পায়াস যদি বলে থাকেন যে, মানুষের জন্ম আদি জীবগোষ্ঠী থেকে হয়েছে, এ ধরণের নীতি চর্চা করার কোন অধিকার আমাদের নেই কারণ তা একক আদিপুরুষ থেকে মানব জন্মের মতবাদের সাথে খাপ খায় না এবং তা মূল পাপ বিষয়ক নীতির বিরোধিতা করে, তাহলে আমি তাকে লাইনচ্যুত বলব। কারণ তিনি এর মাধ্যমে বিজ্ঞানের শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত একটি বিষয়ে ধর্মীয় শিক্ষাক্ষেত্রের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।]
এর পরই পায়াস সেই চির পরিচিত কথাগুলো লিখেছেন যা ক্যাথলিকদেরকে একই সাথে বিবর্তন ও সৃষ্টিতত্ত্বে বিশ্বাস করার অনুমতি প্রদান করে। মানব দেহের বিবর্তন বিজ্ঞানের শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত একটি প্রামাণ্য বিষয় আর সৃষ্টিতত্ত্বের আত্মা বিষয়ক ধারণা ধর্মীয় শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত। এ প্রসঙ্গে পায়াসের কথাগুলো এরকম:
মানব বিজ্ঞান এবং পবিত্র ধর্মতত্ত্বের বর্তমান অবস্থানে দাড়িয়ে চার্চের শিক্ষক কর্তৃপক্ষ ততক্ষণ পর্যন্ত বিবর্তনের মাধ্যমে গবেষণা এবং আলোচনা করতে বাধা দেন না, যতক্ষণ এটা কেবলই মানুষের দেহের প্রাক-অস্তিত্বের কথা বলে। আগের কোন জীবিত বস্তু থেকে মানব দেহের উদ্ভব ঘটতেই পারে। কিন্তু এই বিবর্তনে আস্থা রাখার পাশাপাশি ক্যাথলিক বিশ্বাসীদের অবশ্যই মানতে হবে, আত্মাগুলো স্রষ্টা তাৎক্ষণিকভাবে সৃষ্টি করেছিলেন।
এই অংশ পর্যন্ত আমি হিউম্যানি জেনেরিসে অবাক হওয়ার মত কিছু পাইনি এবং এর মাধ্যমে এমন কিছুও ঘটেনি যা পোপ জন পলের সাম্প্রতিক অভিনব মন্তব্যের ঘোর কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু বিস্তারিত পড়ার পর আমি বুঝতে পারলাম, পোপ পায়াস বিবর্তন সম্পর্কে আরও বেশী বলেছেন, যার অধিকাংশই কোন উক্তির মধ্যে আগে পাইনি। আর পায়াসের এই কথাগুলো পোপ পলের উক্তিকে আরও চমৎকার করে তুলেছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পায়াস জোড় করেই বলেছেন, বিবর্তন নীতিগত দিক থেকে খুব সঙ্গত, যদিও তত্ত্ব হিসেবে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং এটা সম্পূর্ণ ভুলও হতে পারে। এগুলো জেনে সবার মনে বদ্ধমূল ধারণার জন্ম হয় যে, পায়াস মিথ্যা নির্ণয়ের জন্য গভীরভাবে অনুসন্ধান করছেন। শেষ উক্তিটির সাথে সাথে পায়াস আরও কিছু কথা বলেছেন যা আমাদেরকে সঠিকভাবে বিবর্তন অধ্যয়নের জন্য বলে:
এই অধ্যয়ন এমনভাবে করতে হবে যেন বিবর্তনের পক্ষে এবং বিপক্ষের সকল মতামতের কারণগুলো সমান গুরুত্বের সাথে বিচার করা হয়। কিন্তু অনেকে রুক্ষ্ণভাবে আলোচনার এই উদার নীতির লঙ্ঘন করেন এবং পূর্বে অস্তিত্বশীল কোন সত্তা বা জীবন্ত বস্তু থেকে মানুষের উৎপত্তি ঘটেছে এই তত্ত্বকে অকাট্য সত্য বলে মনে করেন। তারা মনে করেন এখন পর্যন্ত মানুষ যা কিছু আকিষ্কার করেছে এবং এই আবিষ্কারের বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে উত্তরগুলো পাওয়া গেছে তা সম্পূর্ণ অলঙ্ঘনীয়। তাদের ভাবটা এমন যেন, স্বর্গীয় বার্তার উৎস থেকে এ সম্বন্ধে কিছুই পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ এই প্রশ্নে স্বর্গীয় বার্তাই সর্বপ্রধান সংশোধন ও সচেতনতার কথা বলে।
এক কথায় বলা যায়, পায়াস একটি শর্ত সাপেক্ষে নোমা গ্রহণ করে নিয়েছেন। শর্তটি হল, ক্যাথলিকরা ততক্ষণ পর্যন্তই কেবল মানব দেহের উৎপত্তির কারণ হিসেবে বিবর্তনকে গ্রহণ করতে পারে যতক্ষণ তারা বিশ্বাস করবে যে, এই বিবর্তনের কোন এক পর্যায়ে ঈশ্বর আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন। অর্থাৎ এই প্রক্রিয়ায় স্বর্গীয় হাত আছে। কিন্তু পায়াস মাঝেমাঝেই বৈজ্ঞানিক ধারণা হিসেবে বিবর্তনের মর্যাদা বিষয়ে বিজ্ঞানীদেরকে পিতৃসুলভ উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: বিবর্তন এখনও সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি এবং এ নিয়ে গবেষণা করতে হলে তোমাদেরকে অতিমাত্রায় সতর্ক হতে হবে। কারণ এটি আমার শিক্ষাক্ষেত্রের ঠিক সীমান্তরেখায় দাড়িয়ে অনেকগুলো ঝামেলাপূর্ণ ইস্যুর সৃষ্টি করে। পায়াসের এই বক্তব্যকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়: এক, অন্য শিক্ষাক্ষেত্রের কারও পক্ষ থেকে উদ্ভূত ভিত্তিহীন উপদ্রব; দুই, বাইরের একজন বুদ্ধিমান ও সচেতন ব্যক্তির বন্ধুসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি। ইতিবাচক ও শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তি হিসেবে দুই শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে আপোস করার তাগিদে আমি সানন্দে দ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সব দেখতে রাজি আছি।
যে কোন দিক দিয়ে চিন্তা করলেই দেখা যায় পায়াসের করা এই দ্বিতীয় (বিবর্তন অপ্রমাণিত এবং বিপজ্জনক) মন্তব্যটি জন পলের করা সাম্প্রতিক মন্তব্যের অভিনবত্ব ও চমৎকারিত্বকে খুব সুন্দরভাবে সংজ্ঞায়িত করে। ক্যাথলিকরা ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে বিশ্বাস করলেই কেবল বিবর্তনকে গ্রহণ করে নিতে পারে, পায়াসের করা এই প্রথম মন্তব্যটি কিন্তু পলের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে খুব একটা সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।
জন পল তার কথা শুরু করেছেন ১৯৫০ সালে পায়াসের পত্রের কথা উল্লেখ করেই। তিনি প্রথমে সানন্দে নোমা নীতিকে গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং বলেছেন, এখানে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য নতুন কিছুই নেই। আগে চার্চ যা বলত এখনও তাই বলছে:
আমার পূর্বসুরী পায়াস ১২ তার হিউম্যানি জেনেরিসে (১৯৫০) ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছেন, বিবর্তন এবং মানুষ ও তার বৃত্তি সংক্রান্ত বিশ্বাসের নীতির মধ্যে কোন বিরোধ নেই।
নোমার শক্তিকে সঠিকভাবে তুলে ধরার জন্য জন পল একটি বড় ধরণের সমস্যা এবং তার সাথে একটি দ্বিতীয় সমাধানের উল্লেখ করেন: বিজ্ঞান বলে মানুষের বিবর্তন অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে হয়েছে আর ক্যাথলিকদের বিশ্বাস হল, কোন এক নির্দিষ্ট সময়ে ঈশ্বর স্বর্গীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আত্মা ফুঁকে দিয়েছেন; বিজ্ঞানের দাবী এবং ক্যাথলিকদের এই বিশ্বাসের মধ্যে আমরা কিভাবে সমন্বয় সাধন করবো:
মানুষের কথা চিন্তা করলে আমরা একটি অস্তিত্বগত পার্থক্যের সন্ধান পাই, অনেকে একে অস্তিত্বগত লম্ফ নামেও আখ্যায়িত করতে পারেন। অর্থাৎ মানুষের অস্তিত্বে বড় রকমের উত্থান রয়েছে। এক্ষেত্রে একজন তো বলতে পারেন, এ ধরণের অস্তিত্বগত বিচ্ছিন্নতা কি মানুষের ভৌত অবিচ্ছিন্নতার বিরোধিতা করে না? বিবর্তনের মূল ধারণায় কিন্তু এই ভৌত অবিচ্ছিন্নতার কথাই বলা হয়। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় যে পদ্ধতি বহু বার ব্যবহার করা হয়েছে তার দ্বারা দুটো ভিন্নধর্মী মতামতকে এক করা সম্ভব হয়, যাদের এক হওয়াকে আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হয়। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষন বর্ননা এবং পরিমাপের মাধ্যমে জীবনের বিভিন্ন দিক স্পষ্ট করে ব্যাখা করে এবং সময়ের সাথে সাথে আরো নির্ভুল ভাবে একে জীবনের সাথে যুক্ত করে। আধ্যাত্মিক সাধনার বিশেষ মূহুর্তকে এভাবে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষন করা যায় না, তথাপি এটা একটা গবেষনামূলক স্তরের আবিস্কার -যা মানব জীবনের সাথে সম্পর্কিত অনেক নিদির্ষ্ট মূল্যবান জিনিসের প্রতি ইঙ্গিত করে।
জন পলের বক্তব্যের অভিনবত্ব এবং সংবাদগত গুরুত্ব নিহিত আছে পায়াসের করা অতি বিরল দ্বিতীয় মন্তব্যের মধ্যে। পায়াস বলেছিলেন, বিবর্তনের ধারণা নীতির মাধ্যমে পাওয়া যায়, একে ধর্মের সাথে সমন্বিত করা যায়, কিন্তু বিবর্তনবাদও মিথ্যা হতে পারে কারণ এর পক্ষে দেয়া প্রমাণগুলোর কোনোটাই খুব বেশী জোড়ালো নয়। এ প্রসঙ্গে জন পল বলে দিয়েছেন, পায়াস যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তুপের সমীক্ষা করছিলেন সেই সময়ের পর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, নতুন একটি সহস্রাব্দের উন্মেষ ঘটেছে। এই পর্যায়ে এসে এমন সব উপাত্ত পাওয়া গেছে এবং আগের তত্ত্বগুলোকে এমনভাবে নতুন করে তোলা হয়েছে যে বর্তমানে আর কেউই বিবর্তন বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। শুভাকাঙ্ক্ষা আছে এমন যে কাউকেই এখন বিবর্তন মেনে নিতে হয়। জন পলের কথাগুলো ছিল এরকম:
পায়াস ১২ তার বক্তব্যে আরও বলেছিলেন, এই মতবাদটিকে (বিবর্তন) নিশ্চিতরূপে গ্রহণ করে নেয়া ঠিক হবে না, কারণ এর কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আজ, সেই পোপলিখিত পত্রের প্রকাশনার প্রায় অর্ধ শতাব্দী পর, এমন সব নতুন জ্ঞান অর্জিত হয়েছে যে বিবর্তনবাদের পক্ষে একাধিক প্রকল্প প্রস্তাব করা সম্ভব হয়েছে। এটি বিশেষভাবে ভাবার বিষয় যে, গবেষকদের কাছে দিন দিন এই তত্ত্বটি অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কিছু আবিষ্কারের কারণেই এই গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্ররোচণা বা পক্ষপাতিত্ব নয়, স্বাধীনভাবে করা বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলগুলোই বিবর্তনবাদের গুরুত্বকে প্রকট করে তুলছে।
উপসংহারে পায়াস এটাই বলেছিলেন যে, বিবর্তন কেবল একটি রীতিসিদ্ধ প্রকল্প; আপাত পরীক্ষার মাধ্যমে একে সমর্থন যোগানো হয়েছে এবং ব্যাপক পরীক্ষার মাধ্যমে এটি মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে। এর প্রায় ৫০ বছর পরে জন পল আবার নোমা নীতির মাধ্যমে বিবর্তনবাদের রীতিসিদ্ধতার কথা বলেছেন। এটা কোন বিশেষ সংবাদ নয়, খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি বলেছেন, বর্তমান উপাত্ত এবং তত্ত্বের মাধ্যমে বিবর্তনবাদ প্রমাণিত হয়েছে। একনিষ্ঠ খ্রিস্টানদেরকেও এখন বিবর্তনবাদ গ্রহণ করে নিতে হবে, সম্ভাব্য সত্য হিসেবে নয় বরং প্রমাণিত সত্য হিসেবে। এক কথায় বলা যায় ক্যাথলিকদের দাপ্তরিক দৃষ্টিভঙ্গি এক সময় ছিল, "এটা সত্য না, কিন্তু প্রয়োজন হলে আমরা তা গ্রহণ করে নিতে পারি"। কিন্তু জন পলের কথার পর সে দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে দাড়িয়েছে, "এটা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে; আমরা সব সময়ই প্রকৃতির সত্যতাকে বরণ করে নেই, এবং এর থেকে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করি।" আমি নিজে বিজ্ঞানের শিক্ষাক্ষেত্রকে প্রকাশ করতে পারি, কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের জটিল জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের শিক্ষাক্ষেত্রের প্রধান নেতার এ ধরণের সমর্থনকে স্বাগত জানাই। এবং আমি রাজা সলোমনের প্রজ্ঞাময় কথাটি আবার বলতে চাই: "তৃষ্ণার্ত গলায় শীতল পানি যেমন লাগে, দূরদেশ থেকে আসা শুভ সংবাদও তেমন লাগে।" (প্রবাদ- ২৫:২৫)
ধর্মের মধ্যে যেমন পরষ্পর বিরোধী মতের লোক আছে বিজ্ঞানেও তেমনটি আছে। আমার বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক সহকর্মী আছেন যারা ধর্ম আর বিজ্ঞানের প্রতি 'স্বতন্ত্র বলয়ের' প্রস্তাবনা দেখে হতাশ হয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই আবার তাদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। আমার মত অজ্ঞেয়বাদী বিজ্ঞানী যারা পোপের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে তাদেরকে উদ্দেশ্যে করে আমার এই সহকর্মী বিজ্ঞানীরা বলেন: "আরে ভাই সৎ হোন; আপনি তো জানেন ধর্ম খুব বেশী ঘোলাটে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং সেকেলে। আপনারা এ ধরণের স্বাগত বার্তা জানাচ্ছেন কেবল এই ভেবে যে ধর্ম খুব শক্তিশালী এবং আমাদের বৈজ্ঞানিক গবেষণার পক্ষে অর্থ ও গণসমর্থন আমাদের জন্য এরকম কূটনৈতিক চালসম্পন্নই হওয়া উচিত।" আমি মনে করি না বিজ্ঞানীদের মাঝে এমন দৃষ্টিভঙ্গি খুব সাধারণ, কিন্তু এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে হতাশ করে। এ কারণেই এই প্রবন্ধ শেষ করার আগে আমি ধর্ম বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু কথা জানাতে চাই। এই কথাগুলো চিন্তাশীল বিজ্ঞানীদের মধ্যকার ঐক্যমতের প্রামাণিক সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করবে। চিন্তাশীল বলতে আমি তাদেরকে বুঝিয়েছি যারা নোমা নীতিকে সেভাবেই সমর্থন করেন যেভাবে পোপ করেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব বা অনুশীলনের কথা বললে আমি কোনক্রমেই ধার্মিক বা বিশ্বাসী নই। কিন্তু ধর্মের প্রতি আমার ব্যাপক শ্রদ্ধা আছে এবং এই বিষয়টি আমাকে সবসময়ই বিস্মিত করেছে। বিবর্তন, জীবাশ্মবিজ্ঞান এবং বেসবলের মত কয়েকটি বিষয় বাদ দিলে ধর্ম ছাড়া আর কোন কিছুই আমাকে এতোটা বিস্মিত করতে পারেনি। এই বিস্ময় অনেকাংশেই নির্ভর করেছে ধর্মের ঐতিহাসিক হেঁয়ালির উপর। পশ্চিমা সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে সুসংবদ্ধ ধর্ম একই সাথে সবচেয়ে অবর্ণনীয় ভীতি এবং সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মানবীয় বিশুদ্ধতাকে লালন করেছে। মানুষের ভিতরের এই ভাল বিষয়গুলো ব্যক্তিগত শত শত ভীতির মুখেও অটল ছিল। (আমি বিশ্বাস করি ধর্মের সাথে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির বিরোধের সূত্র ধরেই যত অনিষ্ট ঘটেছে। ইনকুইজিশন থেকে ইকুইডেশন পর্যন্ত পুরোটা জুড়েই ক্যাথলিক চার্চ মানবীয় ভয়-ভীতির একটা অংশের যোগান দিয়েছে- কিন্তু এর কারণ কেবল এই যে, পশ্চিমা ইতিহাসের একটা বিশাল অংশ জুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির প্রভাব বিদ্যমান ছিল। আমার এই বিশ্বাসী লোকেরা আরও অনেক আগে অর্থাৎ ওল্ড টেস্টামেন্টের যুগেও অনেক নৃশংসতার কারণ হয়েছিল, কিন্তু সে সময় যুক্তিবাদীদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতাও প্রায় সমান ছিল।
আমি শ্রদ্ধার সাথে মনেপ্রাণে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যে (NOMA সমাধান) বিশ্বাস করি। নোমা শুধুমাত্র একটি কূটনৈতিক চাল নয়, বরং এটি আমাদের নৈতিকতা এবং বুদ্ধিমত্তার প্রধান অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে। নোমা সমাধানের পথকেও দুই ভাগে ভাগ করে। ধর্ম যদি বিজ্ঞানের শিক্ষাক্ষেত্রের মধ্যে অবস্থিত প্রকৃতির বাস্তবিক চেতনার ব্যাখ্যায় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তাহলে বিজ্ঞানীরাও পৃথিবীর পরীক্ষণমূলক সংবিধানের উচ্চতর জ্ঞানের আলোকে তাদের নৈতিক সত্যের অন্তর্দৃষ্টি আছে বলে দাবী করতে পারে না। যে পৃথিবীতে বিভিন্নমুখী এতো অনুরাগ সেখানে এ ধরণের পারষ্পরিক দীনতার গুরুত্ব অনেক।
ধর্ম অনেকের কাছে এতোই গুরুত্বপূর্ণ যে তারা যেকোন ধরণের আয়েশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ধর্মতত্ত্বের দারস্থ হয়। উদাহরণস্বরুপ আমি ব্যক্তিগতভাবে সন্দেহ করতে পারি, পোপ স্বর্গীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে যে আত্মার কথা বলেছেন তা আমাদের ভয় কিছুটা দূর করার জন্যই। বিবর্তন যেখানে সকল সৃষ্টিকে সমান মনে করে সেখানে পোপ এই ধারণা প্রদানের মাধ্যমে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস টিকিয়ে রাখলেন। কিন্তু, আমি এটাও মানি যে আত্মা এমন একটি জিনিস যা বিজ্ঞানের শিক্ষাক্ষেত্রের বাইরে। আমার বিশ্ব আত্মাকে প্রমাণিত বা অপ্রমাণিত করতে পারে না, কিন্তু আত্মা নিয়ে ইতং বিতং আমার শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য কোন হুমকিও নয়। যদিও আমি আত্মা সম্পর্কে ক্যাথলিক বিশ্বাসকে পুরোপুরি মানি না তথাপি, আমি অবশ্যই তাদের রূপকাত্মক মূল্যবোধকে সম্মান করি। কারণ এই মূল্যবোধ নৈতিক আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং মানুষের সুপ্তশক্তি সম্বন্ধে আমাদের যে অগাধ বিশ্বাস আছে তাকেও স্বীকৃতি দেয়। চেতনার বিবর্তন আমাদের উপর যত শিষ্টাচার, যত্নশীলতা এবং নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের চেতনা আরোপ করেছে তার সবই আমাদের এই সুপ্তশক্তির অন্তর্ভুক্ত।
প্রকৃতির বাস্তবতা সম্বন্ধনীয় কোন জ্ঞান থেকে নয় বরং নৈতিক অবস্থান থেকে আমি প্রকৃতি বিষয়ক "কোল্ড বাথ" তত্ত্বের পক্ষে কথা বলছি। এই তত্ত্ব বলে, প্রকৃতি সত্যিকার অর্থেই নিষ্ঠুর এবং অভিন্ন হতে পারে। আমাদের নৈতিক ডিসকোর্সের সাথে এর কোন সমঝোতা নেই, কারণ প্রকৃতি আমাদের শান্তির নীড় হবার জন্য গঠিত হয়নি, প্রকৃতি জানতো না যে আমরা আসছি এবং রূপকার্থে বললে বলতে হয় সে আমাদের পরোয়াই করে না। আমরা তো সর্বশেষ ভূতাত্ত্বিক মাইক্রো সেকেন্ডে অনেকটা অনধিকার চর্চাকারীর মতো আবির্ভূত হয়েছি। আমি এ ধরণের অবস্থানকে মুক্তি দানকারী মনে করি, এই অবস্থান কোন মতেই বন্ধন সৃষ্টিকারী হতে পারে না, কারণ এটা গ্রহণ করলে আমরা নৈতিক ডিসকোর্স গ্রহণ করার পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি। এই স্বাধীনতাটাই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মত করে কথাটাকে এভাবে বলা যায়, প্রকৃতির বাস্তবতা থেকে পরোক্ষভাবে নৈতিক সত্য উদ্ঘাটন করা যেতে পারে, এ ধরণের ভ্রান্তি থেকে দূরে থাকাই কাম্য।
কিন্তু এটাও সত্য যে এই অবস্থান অনেককেই ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে। প্রকৃতির ব্যাপক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের কাছে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য ঠেকে। তারা বিবর্তনের সকল ঘটনাকে সত্য মেনে নেয়, এবং এ থেকেই মানব জন্মের নিগূঢ় অর্থ সন্ধানের চেষ্টা চালায়। এর সাথে কখনও কখনও ধর্মের শিক্ষাক্ষেত্র যুক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালের ৩রা এপ্রিল যে ব্যক্তি জন পলের বক্তব্যে ব্যথিত হয়ে নিউ ইয়র্ক টাইম্সে লিখেছিলেন তার কষ্টকেও আমি এখানে হেলা করতে চাই না। তিনি লিখেছিলেন:
পোপ জন পলের বিবর্তন মেনে নেয়ার ঘটনায় আমার দ্বিধান্বিত হৃদয় অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছে। ভালোবাসা এবং আলোকের অধিকারী এক ঈশ্বরের সৃষ্ট বিশ্বে সকল ধরণের ব্যথা আর কষ্টের সমস্যা নিয়ে বেঁচে থাকা খুব কষ্টকর, যদিও সে একজন সৃষ্টিতত্ত্ববাদী হয়। কিন্তু সৃষ্টতত্ত্বে বিশ্বাসীরা অত্যন্ত এইটুকু বলতে পারে, স্রষ্টার হাতে যে মূল সৃষ্টির সূচনা ঘটেছিল তা সম্পূর্ণ মহৎ, শান্তিপূর্ণ, নির্দোষ এবং ভদ্র ছিল। কিন্তু বিবর্তনকে কেন্দ্র করে এমন কোন কথা বলা সম্ভব কি? বিবর্তনের কোন আধ্যাত্মিক তত্ত্ব দিয়েও এমনটি বলা সম্ভব না। এই বিবর্তনের মূলে রয়ে গেছে কষ্ট-বেদনা, হৃদয়বিদারক নিষ্ঠুরতা এবং সন্ত্রাস। বিবর্তনের যন্ত্র শিকারী পশুর ধারালো দাঁত হয়ে মরণ ভয়ে চিৎকার করতে থাকা শিকারের জীবন্ত মাংসের উপর আপতিত হয়। বিবর্তনই যদি সত্য হয় তাহলে আমি বলব, আমার বিশ্বাস এর থেকে অনেক রুক্ষ্ণ সমুদ্রে পাল তুলতে পারে।
আমি এই লোকের যুক্তিকে মানি না, কিন্তু এটা মানি যে, তার সাথে খুব ভাল বিতর্কে জড়িয়ে পড়া যায়। আমি "কোল্ড বাথ" তত্ত্বকে একটু অন্যভাবে বলতে পারি বা এতে একটু পরিবর্তন আনতে পারি। তাহলে সে হয়ত প্রকৃতিতে বংশগতির আধ্যাত্মিক অর্থ করতে আরও উৎসাহিত হবে। যদিও এ ধরণের উৎসাহের অর্থ অনেকটা অনচ্ছ। কিন্তু, এর মাধ্যমে আমরা উভয়েই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পারি এবং এই নিগূঢ় উত্তরবিহীন প্রশ্নগুলো আরও ভালভাবে বোঝার শিক্ষা নিতে পারি। আমার বিশ্বাস, এখানেই নোমা তথা বিজ্ঞান এবং ধর্মের সম্পর্কহীন পৃথক শিক্ষাক্ষেত্র তত্ত্বের গভীর প্রয়োজনীয়তা এবং শক্তি নিহিত আছে। নোমা বিজ্ঞান ও ধর্মের পারষ্পরিক শ্রদ্ধাশীল ডিসকোর্সের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করে এবং এদের উভয়কে অনুমতি প্রদান করে। এই ডিসকোর্স উভয় শিক্ষাক্ষেত্র থেকে ক্রমাগত ইনপুট নিয়ে প্রজ্ঞার একমাত্র চূড়ান্ত গন্তব্যের পানে ধাবিত হয়। মানুষ যদি আসলেই বিশেষ কিছু হয় তাহলে তার এই বিশেষত্ব নিয়ে তাকেই ভাবতে হবে এবং কথা বলতে হবে। পোপ জন পল ২ নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত হয়ে বলবেন যে, তার শিক্ষাক্ষেত্র সর্বদাই এই বিভাজন মেনে এসেছে। সেই শিক্ষাক্ষেত্র যে বলে, "in principio, erat verbum" অর্থাৎ "সবকিছুর শুরুতে ছিল বিশ্ব"।
লেখার বাইরের কথা
এই প্রবন্ধের শুরুতে ভ্যাটিকানের যে মিটিংয়ের কথা বলা হয়েছে তার সংগঠক এবং অন্যতম অংশগ্রহণকারী ছিলেন কার্ল সেগান। তিনি আমার সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করেছেন এবং দুটি প্রধান অথচ বিপরীত ক্ষেত্র তথা বিজ্ঞান ও ধর্মের এ ধরণের বিশ্বস্ত সহযোগিতাভিত্তিক বিভাজনকে স্বাগত জানিয়েছেন। কার্ল আমার নিকটতম বন্ধুদেরও একজন। যেদিন এই প্রবন্ধের প্রুফ দেখছিলাম সেদিনই তার অসময়ে মৃত্যুর খবর আমার কাছে পৌছায়। আমি তখন কেবল গান্ধীর মৃত্যুতে নেহেরুর কথাগুলো মনে করতে পেরেছিলাম: "আলো বিদায় নিয়েছে এবং অন্ধকার আবার রাজত্ব কায়েম করেছে।" কিন্তু কার্ল ৬৩ বছরের ছোট্ট জীবনে যা করেছে তা মনে হতেই আমি ভিন্ন কিছু ভাবা শুরু করলাম। আমি ভাবতে লাগলাম আরও অল্প বয়সে মৃত্যুবরণকারী সঙ্গীতজ্ঞ হেনরি পার্সেলের মৃত্যুতে জন ড্রাইডেনের লেখা বুলিগুলো: "He long ere this had tuned the jarring spheres, and left no hell below."
রোমে কার্ল সেগানের সাথে যে দিনগুলো কাটিয়েছিলাম সেগুলো ছিল আমাদের বন্ধুত্বের সর্বোত্তম দিন। সেই চিরন্তন শহরের আনাচে কানাচে দুজনে ঘুরে বেড়াতাম আর বিস্মিত হতাম; এর অভিভূত করে দেয়ার মত স্থাপত্য এবং ইতিহাস আর... খাদ্যের (!) কল্যানে। কার্লের বিস্ময়টাই ছিল বিস্ময়কর। কারণ সে এমন এক দেশ দেখে অভিভূত হয়েছিল যে দেশে তথনও জনপ্রিয় বিজ্ঞানের সর্বকালের সেরা টিভি সিরিজ "কসমস" সম্প্রচার করা হয়নি।
আমি এই প্রবন্ধটি তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি। আমার মতো কার্লও আত্মার অনস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান ছিল। আমাদের এই ধারণা ভুল, কেবল একটি কারণেই আমি এটা ভাবতে চাই না। কারণটি হল, আত্মা থাকলেই কেবল আমরা দুজনে মহাবিশ্বের অনন্ত পরিসরে বন্ধুর মত বিচরণ করতে পারি, আর ব্যক্তিগতভাবে আমি তার মত একটি চমৎকার আত্মার সাথে কথা বলতে পারি।
পরিশিষ্ট
ইভানজেলিক্যাল - প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে একটি বিশেষ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি।
নিউক্লিয়ার উইন্টার - ব্যাপক নিউক্লীয় যুদ্ধের কারণে পৃথিবী শীতল হয়ে যেতে পারে, এই অবস্থা।
পন্টিফিশিয়াল একাডেমি অফ সাইন্সেস - পোপ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান উন্নয়ন সংস্থা।
প্রোটেস্ট্যান্ট - পোপকে মানে না। বাইবেলকে আক্ষরিক অর্থে সত্য মানে এবং এটিকে সত্যের একমাত্র উৎস বলে।
ক্যাথলিক - পোপকে মান্য করে। খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে পরিবর্তনে বিশ্বাসী।
ইয়েশিভা - ইহুদি ধর্মগ্রন্থ শিক্ষার স্থান।
রাব্বি - ইহুদি ধর্মপ্রচারক।
টিপ ও'নেইল - যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টিটিভের স্পিকার।
ইউক্যারিস্ট - খ্রিস্টের শেষ প্রাতঃরাশকে নির্দেশ করে।
ট্রানসাবস্ট্যানসিয়েশন (আন্তঃপ্রমাণীকরণ) - ইউক্যারিস্টে রুটি এবং মদের সাবস্ট্যান্স খ্রিস্টের দেহ এবং রক্তে পরিণত হয়েছিল, এই বিশ্বাস।
পলিজেনিজ্ম - মানুষের উৎপত্তি বিভিন্ন প্রজাতি থেকে বংশানুক্রমে হয়েছে, একটি মাত্র পূর্বপুরুষ থেকে (মনোজেনিজ্ম) নয়। ধর্ম ও বিবর্তন উভয় ক্ষেত্রেই এই বিশ্বাস আছে।
ইনকুইজিশন - রোমান ক্যাথলিক চার্চ কর্তৃক ধর্মদ্রোহী এবং রাষ্ট্রদ্রোহীদের কঠোর শাস্তি দেয়ার পদ্ধতি।
অধ্যাপক স্টিফেন জে গুল্ডের "Nonoverlapping Magisteria" লেখাটি Natural History 106 (March 1997): 16-22 এ প্রকাশিত। শিক্ষানবিসের করা বাংলা অনুবাদটি আমাদের মুক্তমনার পরবর্তী বই -‘বিজ্ঞান ও ধর্ম – সংঘাত নাকি সমন্বয়?’– প্রকাশিতব্য সংকলন-গ্রন্থের জন্য নির্বাচিত হল - মুক্তমনা সম্পাদক।